words per minute
8
LaNarmi
00:00
Speed
যাত্রাবাড়ির ছোট্ট একটা কলোনিতে ওরা থাকে। টুকি, টুকির মা ভাই ও বাবা। গলির মোড়ে দর্জির দোকানে কাজ করেন বাবা। বাবার সামান্য আয়ে কোনোমতে দিন চলে ওদের।
টুকির ভাই রতন কলেজে পড়ে। চোখভরা স্বপ্ন তার। কয়েক দিন ধরেই টুকি দেখছে ভাইয়া খুব ব্যস্ত। ক্লাস থেকে দেরিতে ফেরে। সেদিন বলল আমরা আজ রাস্তা বন্ধ করেছি। গাড়ি চলতে দেইনি। টুকি বলল কেন? রাস্তা বন্ধ করে তোমরা কী করছ?”
আমরা প্রতিবাদ করছি। আমাদের দেশ, আমাদের সম্পদ। জনগণের সম্পদ রক্ষা করতে হবে। কৌতূহলী হয়ে টুকি জিজ্ঞেস করল, তোমাদের ভয় করে না?”
দৃঢ়কণ্ঠে ভাইয়া বলল নাহ! কীসের ভয়! আমরা ভাষা-আন্দোলন করেছি, মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমাদের পূর্বপ্রজন্ম আমাদের শক্তি। আমরাও লড়াই করব।
টুকি বলল সাবধান।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে টুকি এসব ভাবছিল। বাইরে কালো ধোঁয়া। গুলির শব্দ। কান বন্ধ হয়ে আসছে ওর। মাকে বলল মা আমার ভয় করছে।
মা-ও খুব উদ্বিগ্ন। তিনি বললেন, তোর বাবা ফোন করেছিল। দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে কাজ করছে। বাইরে প্রচণ্ড গুলি হচ্ছে। উৎকণ্ঠিত হয়ে মা বললেন রতনকে নিয়ে আর পারি না। ওকে ফোনে পাচ্ছি না।
মায়ের মুখে চিন্তার ছাপ। ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেলেন তিনি।
টুকি বলল, বাবাকে এখনই চলে আসতে বলো।
মা বললেন তোর লাল জামাটার কাজ প্রায় শেষ। নিয়েই চলে আসবেন।
টুকির মনে শঙ্কা। বাবা ও ভাইয়ের জন্য ওর মনটা কেমন গুমরে উঠল। একটা লাল জামার শখ ওর। বাবা খুব সুন্দর করে নকশা করেছেন। কিন্তু এখন আর জামা চায় না সে। ওর বুক ঢিব ঢিব করছে। মাকে বলল বাবাকে আবার ফোন দাও। ফোন কানে নিয়ে মা অপেক্ষা করলেন। কাউকেই পেলেন না। ভয়ংকর শব্দ করে আকাশে চক্কর দিচ্ছে হেলিকপ্টার। পাশের বাসা থেকে রানু চাচির গলা শোনা যাচ্ছে। চিৎকার করে বলছেন ও আল্লাহ, রহম করো। সবাই সাবধান। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করছে। টুকি জানালার পাশ থেকে সরে দাঁড়াল। আকাশ জুড়ে কালো মেঘের মতো ধোঁয়া। ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে টিয়ারগ্যাসের গন্ধ।
বাইরে প্রচণ্ড শোরগোল। গলির মোড় থেকে সবাই ছুটে পালাচ্ছে। পাশের বস্তিতে আগুন জ্বলছে।
টুকিদের দরজায় শব্দ হলো। মা দরজা খুললেন পেছনে টুকি। মা চিৎকার করে উঠলেন কী হয়েছে? ভিড়ের ভেতর থেকে কে যেন বলল গুলি লেগেছে। টুকি উঁকি দিয়ে দেখল রক্তে ভিজে গেছে রতনের সাদা শার্ট। দেখতে পেল ভাইয়ার নিথর শরীর। ঝাপসা হয়ে এলো টুকির চোখ। টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে পানি। বুক ফেটে কান্না এলো ওর।
২০২৪ সালের ২১শে জুলাই। গভীর রাত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেল রতন।
টুকি ভাবল, লাল জামার মতো টুকটুকে হয়ে গেছে ভাইয়ার শার্ট।
ও আর কোনোদিন লাল জামা পরবে না ।